রাত ২:৫১,   মঙ্গলবার,   ২৬শে মার্চ, ২০১৯ ইং,   ১২ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,   ১৭ই রজব, ১৪৪০ হিজরী
 

চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে তারা কোথায়?

অনলাইন ডেস্ক:
একটা সময় বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ধরা হতো চলচ্চিত্রকে। নতুন চলচ্চিত্রের অপেক্ষায় থাকতো চলচ্চিত্র প্রেমীরা। সপ্তাহ শেষে প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি সরকারি টেলিভিশন ভিটিভিতে নির্ধারিত দিনের ছবি দেখার অপেক্ষায় থাকতো দর্শক। বলা হয়, তখন চলচ্চিত্রের সোনালী দিন ছিলো। নায়ক রাজ রাজ্জাক, ববিতা, শাবানা, ফারুখ, জসীম, ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ, শাবনূর, ওমর সানি, মৌসুমীসহ সব নায়ক-নায়িকাদের ছবিই ছিলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

বাংলা সিনেমার সোনালী যুগ বলাতে আমরা বুঝি ৬০ থেকে ৮০’র দশক সময়কে। তখনকার সময়ে ছবি মুক্তি মানেই সিনেমা হল ভর্তি দর্শক। বর্তমান সময়ের মতো প্রযুক্তির দিক থেকে উন্নত না হলেও তখনকার ছবিগুলো ছিল মানসম্পন্ন। এছাড়া সিনেমার গল্পও ছিলো অনন্য। যার উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‌‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘সারেং বউ’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’সহ আরো অনেক ছবি। হলগুলো সব ছবি দিয়েই বেশ ব্যবসা করতো।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের রূপ। সারা দেশ যখন প্রযুক্তির দিক দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ক্রমশই পিছিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্র।

এক সময় এফডিসিতে বছরে ৯০ থেকে ১১০টি সিনেমা তৈরি হতো। এখন সেখানে বছরে ৫০ থেকে ৬০টির মতো সিনেমা তৈরি হয়। যার মাঝে বেশ কিছু চলচ্চিত্র মাঝপথে এসে থেমে যায়। দেখে না আলোর মুখ। দেশে যেখানে আগে ১২০০-১৫০০ হল ছিলো সেখানে আজ হল সংখ্যা ২০০-২৫০টি। এসবের মধ্যে আবার কিছু হলে শুধু ঈদে ছবি চলে।

বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সোনালী দিনের নায়ক-নায়িকা আজ অনেকেই বেঁচে নেই। কিন্তু যারা আজ এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সারা দেশ তথা দেশের বাইরে সম্মানিত তারা কতটুকু চলচ্চিত্রকে দিতে পেরেছেন বা দিচ্ছেন! এমন প্রশ্ন এখন প্রায়ই উঠছে।

অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বাংলা চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের এমন ক্রান্তিকালে যারা চলচ্চিত্র থেকে নিজের অবস্থান আজ শক্ত করেছেন তারা আজ অনেকেই পাশে নেই। সবাই ব্যস্ত আছেন যার যার ব্যক্তিগত ব্যবসা, কিংবা নিজেদের জীবন নিয়েই। যেই এফডিসি একসময় তাদের এতো আপন ছিলো এই এফডিসি থেকে আজ তারা অনেক দূরে। বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাদের দেখা গেলেও চলচ্চিত্রকে এই বর্তমান বেহাল দশা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য তাদের ভূমিকা নিরব।

যৌথ প্রযোজনার অনিয়ম নিয়ে বেশ কিছুদিন সোচ্চার ছিলেন চলচ্চিত্রের সিনিয়র শিল্পী থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের অনেক তারকাই। কিন্তু দিন দিন ছবি ও হল কমে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই বললেই চলে।

এবার দেখে নেয়া যাক চলচ্চিত্রের কিছু গুণী শিল্পীদের। যারা চলচ্চিত্র থেকে আজ অনেকটাই দূরে। কিন্তু বাংলা ছবির সেই আগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে তাদের মতো গুণী শিল্পী ও অভিভাবকদের খুব বেশী প্রয়োজন।

ফারুক:
বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন নায়ক ফারুক। তিনি একাধারে প্রযোজক, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তিনি লাঠিয়াল, সুজন সখী, নয়নমনি, সারেং বৌ, গোলাপি এখন ট্রেনে, সাহেব, আলোর মিছিল, দিন যায় কথা থাকে, মিয়া ভাই সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৮ সালে আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।

চলচ্চিত্রে তিনি ‘মিয়া ভাই’ হিসেবেই পরিচিত। তাকে সবাই মানেন। তরুণ বয়স থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এফডিসিতে বেশ ঘন ঘন আসা যাওয়া ছিলো তার। চলচ্চিত্রের অনেকেই ভেবেছিলেন তার হাত ধরে হয়তো নতুন দিনের সূচনা হবে ঢাকাই চলচ্চিত্রের। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হবার পর সবার আশা ছিলো হয়তো চলচ্চিত্র নিয়ে এবার সংসদে কথা বলার একজন মানুষ পাওয়া গেলো। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে-বালি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হবার পর সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন তিনি। সেখানে চলচ্চিত্র নিয়ে সংসদে আপনার ভূমিকা কী থাকবে জানতে চাইলে সরাসরি তিনি বলেন, ‘আগে যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে তাদের জন্য ও নৌকার জন্য কাজ করবো আর যদি সময় পাই তাহলে চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করবো।’ বর্তমানে তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েই ব্যস্ত আছেন।

কবরী সারোয়ার:
বাংলা চলচ্চিত্রের ষাট ও সত্তরের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের নায়িকা ছিলেন। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ ছবির নায়িকা হিসেবে অভিনয় জীবনের শুরু। এরপর অভিনয় করেছেন হীরামন, ময়নামতি, চোরাবালি, পারুলের সংসার, বিনিময়, আগন্তুক সহ জহির রায়হানের তৈরি উর্দু ছবি ‘বাহানা’ এবং ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পান তিনি। বর্তমানে তিনিও ব্যস্ত আছে রাজনীতি নিয়েই। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রে নতুন কোন ছবিতে বেশ লম্বা সময় হলো তাকে দেখা যায় না। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাকে তেমন চোখে পড়ে না। চলচ্চিত্র থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনিও তেমন চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য ভূমিকা রাখেননি বললেই চলে।

আলমগীর:
আলমগীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক অ্যাকশন, রোমান্টিক অ্যাকশন, ফোক ফ্যান্টাসিসহ সব ধরনের চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন সফল। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক, গায়ক ও পরিচালক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা বিভাগে ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি তার ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত আছেন। গতবছর তার পরিচালিত ও প্রযোজিত ‘একটি সিনেমার গল্প’ নামের একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। তবে ছবিটি ব্যবসা সফল হতে পারেনি। এরপর নিজেকে বেশ গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্র নিয়ে এখন তার তেমন মাথা ব্যথা নেই বললেই চলে।

শাবানা:
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেত্রী শাবানা। শিশুশিল্পী হিসেবে নতুন সুর চলচ্চিত্রে তার চলচ্চিত্রে আবির্ভাব ঘটে। পরে ১৯৬৭ সালে চাকরি চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। শাবানার প্রকৃত নাম রত্না। তিনি তার ৩৬ বছর কর্মজীবনে ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ষাট থেকে নব্বই দশকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন এই অভিনেত্রী। ২০০০ সালে রূপালী জগত থেকে নিজেকে আড়াল করে ফেলেন এ নায়িকা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অভিনয়ের জন্য ৯ বার ও প্রযোজক হিসেবে ১ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। চলচ্চিত্র থেকে এত কিছু প্রাপ্তির পরও তিনি আজ চলচ্চিত্র থেকে দূরে। মাঝে কিছুদিন আগে নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। সে সময় ঘোষণাও দিয়ে ছিলেন আবারও চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগ করবেন তিনি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরেই অবস্থান করছেন। যিনি কিনা চলচ্চিত্র থেকে এত নাম কামিয়েছেন হুট করে চলচ্চিত্র থেকে তার চলে যাওয়া এক শূণ্যতার তৈরি করেছে। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বেহাল দশা নিয়ে তিনিও বেশ চুপচাপ। যেনো একপ্রকার গা ছাড়া ভাব।

ববিতা:
দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়ে নেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা। তার অভিনীত সর্বশেষ ছবি মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। নাম ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’। এটি পরিচালনা করেন নার্গিস আক্তার। বর্তমানে ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই ব্যস্ত আছেন এ অভিনেত্রী। তার একমাত্র ছেলে কানাডা থাকেন। বছরের অনেকটা সময় ছেলের সঙ্গে কাটান তিনি। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে দেখা মিলে তার। কিন্তু চলচ্চিত্রের এই খারাপ সময় তার তেমন মাথা ব্যথা নেই। সম্প্রতি অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে ছবি নির্মাণের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ববিতা। তিনি জানান, ‘যত রকম চরিত্রে অভিনয় করেছি তাতে আমি সন্তুষ্ট। তবুও মনে হয় কোনো একটি চরিত্রে অভিনয় করা হয়নি। আর তা হচ্ছে অটিস্টিক শিশুদের ওপর লেখা গল্পের যে কোনো চরিত্র। আমার অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে নির্মিত ছবিতে অভিনয় করা।’ চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা জানালেও চলচ্চিত্রের বেহাল দশা থেকে মুক্তিতে তার ভূমিকা কতটুকু তা দেখার বিষয়!

নায়ক-নায়িকা তথা চলচ্চিত্রে বর্তমানে শিল্পী সংকটে ভুগছে। পাশাপাশি হল কমে যাওয়ার বিষয়টি তো আছেই। চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময় সিনিয়র অনেক শিল্পী ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তারা নিজেরাই চলচ্চিত্রের বিষয়ে উদাসীন। হয়তো তাদের সঠিক নেতৃত্ব পেলে তাদের হাত ধরেই আবার আলোর মুখ দেখবে ঢাকাই চলচ্চিত্র।


আবহাওয়া

সিলেট
16°

অ্যাপস

সামাজিক নেটওয়ার্ক

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি