বিকাল ৪:২৩,   শুক্রবার,   ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং,   ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ,   ১৪ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী
 

মাতৃত্বের জন্য সতর্কবার্তা

অনলাইন রিপোর্ট:
ফরিদা ও সোহেল দম্পতি যখন দেখা করতে এলো, দু’জনেরই চিন্তিত মুখ দেখে আমি আশ্বস্ত করলাম। দু’জনেরই এটা দ্বিতীয় বিয়ে। আট মাস আগে তারা বিয়ে করেছেন। ফরিদার বয়স ৩১, সোহেলের ৩৫।

প্রথম বিয়েতে কোনো বাচ্চা হয়নি দেখে ডিভোর্স হয়ে গেছে ফরিদার। সোহেলের প্রথম স্ত্রীর জরায়ুর টিউমার অপারেশন করার সময় জীবন বাঁচানোর জন্য জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছিল। এ অপারেশনটি হয় কোনো সন্তানের জন্মের পূর্বেই। সোহেল সাহেব ও কোনো সন্তানের মুখ দেখতে পারেননি। ফরিদার গত এক বছর ধরে মাসিক অনিয়মিত হচ্ছে আর শেষ চার মাসে কোনো মাসিক হয়নি।

ফরিদার ওভারি বা ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম। তার নিজের ডিম্বাণু দিয়ে প্রেগন্যান্সি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মাত্র ৩১ বছর বয়সে ডিম্বাণুর পরিমাণ কিভাবে এত কমে যায়? আমরা যদি একটি মেয়ের জন্মের অতীত ইতিহাস জানি, তাহলে অনেকের জন্য এটা বুঝতে পারা কিছুটা হলেও সহজ হবে।

মাতৃগর্ভে একটি মেয়ের বয়স যখন ১৬-২০ সপ্তাহ মাত্র, তখন ডিম্বাণুর একদম আদিঅবস্থা, যেটা চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় ‘জার্মসেল’, তার সংখ্যা থাকে ৬-৭ মিলিয়ন এবং এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। এরপর শুরু হয় সংখ্যা কমার পালা। জন্মের সময় জার্মসেলের সংখ্যা থাকে ৫ লাখ থেকে ২ মিলিয়ন। শতকরা ৭০-৮০ ভাগ জার্মসেল নষ্ট হয়ে যায় একটি মেয়ে শিশু তার পার্থিব জীবন শুরু করার আগেই।

প্রথম মাসিক যখন শুরু হয়, তখন ডিম্বাণুর পরিমাণ থাকে ৩ লাখ। একটি ডিম্বাণুকে পরিপক্ব করার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০০০টি অপরিপক্ব ডিম্বাণুকে আত্মাহুতি দিতে হয়। একটি মেয়ের প্রথম ডিম্বাণু তৈরি হওয়া বা ওভুলেশন হওয়া হতে শুরু করে মেনোপজে পৌঁছান পর্যন্ত প্রায় ৪০০-৫০০টি ওভুলেশন হতে পারে। ৬-৭ মিলিয়ন দিয়ে যাত্রা শুরু হয় আর শেষ হয় মাত্র ৪০০-৫০০টি দিয়ে।

এই ডিম্বাণু নিঃশেষ হওয়ার বিষয়টি একদম প্রকৃতি প্রদত্ত একটি একমুখী যাত্রা। জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করে ওভুলেশন বন্ধ রাখলে বোধকরি ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া রোধ করা যাবে। এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। বরং কখনও কখনও আরও ত্বরান্বিত হারে ডিম্বাণু নিঃশেষ হতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়-

  • ওভারি বা ডিম্বাশয়ে কোনো সিস্টব বা সিস্টের অপারেশন হলে বা কোনো কারণে একটি ওভারি কেটে ফেললে।
  • কোন কারণে ডিম্বনালি বা ফেলোপিয়ান টিউব কেটে ফেললে, যা ওভারির রক্ত চলাচল কমিয়ে দিতে পারে।
  • পলিসিস্টিক রোগীদের চিকিৎসা হিসেবে কখনও সখনও ওভারি ড্রিলিং করতে হয়, যেটা ওভুলেশন হওয়াতে সাহায্য করে। রোগী যদি পলিসিস্টিক ওভারি সমস্যায় না ভোগেন কিন্তু কোন কারণে ড্রিলিং করা হয়, এটা ওভারির ডিম্বাণুর পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
  • জেনেটিক কোনো অসুখ কোনো পরিবারে থাকতে পারে, যার কারণে মেনোপোজ ত্বরান্বিত হয় বা খুব তাড়াতাড়ি ডিম্বাণু নিঃশেষ হয়ে যায় (যেমন ‘মোজাইকটার্নার সিনড্রোম’ এর রোগী, যারা দেখতে পরিপূর্ণ নারীর মতো, এদের মাসিক নিয়মিতভাবেই হয় কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ওভারির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়)।
  • ক্যান্সারের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও হতে পারে।
  • অনেক সময় ব্যাখ্যাতীত কারণ হতে পারে। মাতৃগর্ভে থাকাকলীন সময়েই আদিডিম্বাণুর পরিমাণ ৬-৭ মিলিয়নের চেয়ে কম ছিল হয়তোবা।
  • পরিবেশ দূষণ কিংবা খাবারে ভেজাল ও কোনোভাবে দায়ী কিনা এটা এখন গবেষণার পর বলা যাবে।

একটি মেয়ের ৩০ বছর বয়সের পর হতে ডিম্বাণু নিঃশেষ হওয়ার পরিমাণ ত্বরান্বিত হয় আর ৩৫ বছরের পর আরও দ্রুত। একটা বয়সের পর ডিম্বাণুর কোয়ালিটিও খারাপ হতে থাকে। ৪৭-৪৮ বছর বয়সেও মাসিক নিয়মিতই হয় অনেকের কিন্তু প্রেগন্যান্সির সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

লেখক : কনসালট্যান্ট, (অবস-গাইনিবিভাগ), বিআরবি হাসপাতাল লিমিটেড


আবহাওয়া

সিলেট
26°

অ্যাপস

সামাজিক নেটওয়ার্ক

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি